দিল্লির রোহিণীর একটি সাধারণ বস্তি। সেখানে বাস করা ৩৪ বছর বয়সী সুইটি বিবি স্বপ্নেও ভাবেননি যে, নিজের দেশের বৈধ পরিচয়পত্র হাতে থাকার পরও তাঁকে একদিন 'বাংলাদেশি' তকমা নিয়ে বন্দুকের নলের মুখে দেশ ছাড়তে হবে। ২০২৫ সালের জুন মাসে শুরু হওয়া তাঁর এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন আইনি ত্রুটি নয়, বরং ভারতে প্রান্তিক ও বাংলাভাষী মুসলিমদের প্রতি রাষ্ট্রীয় বঞ্চনা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক নির্মম দলিল।
পরিচয়পত্রের অসারতা ও মৃত্যুর হুমকি
আধার কার্ড ও নাগরিকত্বের বৈধ নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও দিল্লি পুলিশ কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই সুইটি বিবিকে আটক করে। তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি। তাঁকে সোজা আসামের গুয়াহাটিতে নিয়ে গিয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF)-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়। সুইটি বিবির অভিযোগ, বিএসএফ জওয়ানরা তাঁকে ও তাঁর তিন নাবালক সন্তানকে সোজা জানিয়ে দেয়, "বাংলাদেশি, চলে যাও। পেছনে ফিরে তাকালে গুলি করা হবে।" প্রাণের দায়ে এক মা তাঁর সন্তানদের নিয়ে গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করতে বাধ্য হন। অনাহার ও চরম আতঙ্কে সেখানে কাটে টানা ১০টি দিন।
ভিনদেশে বন্দিজীবন ও অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম
জঙ্গল পেরিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছানোর পর সেখানকার পুলিশ তাঁদের 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী' হিসেবে আটক করে। নিজের দেশে যিনি নাগরিক, ভিনদেশে তিনি হয়ে গেলেন অনুপ্রবেশকারী। ফলস্বরূপ ৬ মাস তাঁকে জেল খাটতে হয়। কারামুক্তির পর শুরু হয় বেঁচে থাকার নতুন লড়াই। ভিক্ষে করে, অন্যের দয়ায় দিন কাটে সুইটির। চোখের জলে ভিজে যাওয়া প্রতিটি রাত কেটেছে নিজের দেশে ফেরার তীব্র অপেক্ষায়।
আইনি লড়াই শেষে ঘরে ফেরা, তবে ঘরহীন
সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ৯ জুলাই, ২০২৬ সালে সুইটি বিবি ও তাঁর পরিবার ভারতে ফেরার সুযোগ পান। কিন্তু এই প্রত্যাবর্তন কোনো স্বস্তির খবর নিয়ে আসেনি। বর্তমানে তাঁদের লড়াইয়ের চিত্রটি এরকম:
- মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই: নিজের দেশে ফিরেও তাঁরা আজ পুরোপুরি বাস্তুচ্যুত ও ঠিকানাহীন।
- শিক্ষার অধিকার হরণ: কাগজপত্র না থাকার অজুহাতে তাঁর ৭ বছরের সন্তানকে স্কুলে ভর্তি নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ।
- জীবিকার সংকট: বেঁচে থাকার ন্যূনতম কোনো উপায় বা ক্ষতিপূরণ রাষ্ট্র তাঁদের দেয়নি।
কাঠগড়ায় মানবাধিকার ও রাষ্ট্রের ভূমিকা
দ্য রেড মাইক-এর প্রতিবেদনে উঠে আসা সুইটি বিবির এই কাহিনি ভারতের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়ে দেয়। কোনো সুষ্ঠু আইনি প্রক্রিয়া বা 'ডিউ প্রসেস' ছাড়াই শুধুমাত্র বাংলাভাষী মুসলিম হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষকে সন্দেহের বশে দেশছাড়া করা হচ্ছে। সুইটি বিবির গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্র যখন রক্ষকের বদলে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন সাধারণ মানুষের জীবনের মর্যাদা ও সাংবিধানিক অধিকার কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে ধুলিস্যাৎ হয়ে যায়।
